যমুনেশ্বরীর ঘাটে শৈশব স্মৃতি ও আমাদের 'ভুলকানী' উৎসব | কবিতা: ওহে যমুনেশ্বরী | লেখক: জে. এইচ. শুভ
ওগো যমুনেশ্বরী
— জে. এইচ. শুভ
ওহে যমুনেশ্বরী!
তোমার বুকে ভাসছে কত তরী।
পড়ন্ত এই বিকেলবেলা তোমায় মনে করি।
তোমার পানে চেয়ে আছি, নেই কোনো ঢেউ;
একলা একা ছন্দ বলছি— পাশে নেই কেউ!
জেলে ভাই ধরছে মাছ ডিঙ্গি নৌকা করে,
তাদের দেখে শৈশবের কথা গেল মনে পড়ে।
আমরা যখন ছোট ছিলাম, ধরত মাছ জেলে;
ছোট ছোট মাছগুলো দিত তারা ফেলে।
শৈশবের বন্ধু মিলে তাদের পিছে ঘুরে,
ফেলানো সেই মাছগুলো নিতাম মোরা কুড়ে।
বাড়ি থেকে সবাই মিলে চাল-মসলা আনি,
সবাই মিলে সেই মাছ দিয়ে খেতাম ভুলকানী!
সেই ভুলকাভাত খেয়ে মোরা আসি তোমার ঘাটে,
তোমার পাশেই খেলি মোরা সবুজ ওই মাঠে।
হয়তো আজ সেই সাথীরা নেইকো আমার পাশে,
স্মৃতিগুলো তবু আজও তোমার ঢেউয়ে হাসে।
আঁচল ভরে কুড়িয়ে নিতাম মুক্তো পারা বালি;
এখন শুধু স্মৃতির পাতায় ঘরটি আছে খালি!
তোমার বুকে হাঁসেরা করছে কত খেলা,
তাদের কোনো খেয়াল নেই— শেষ হচ্ছে বেলা।
শীত শেষে ধীরে ধীরে আসছে বসন্ত,
তোমার বুকেও ঢেউ নেই, হয়ে আছো শান্ত।
উত্তরের ঐ হিমেল হাওয়ায় কাঁপে বাঁশঝাড়,
মাঠের ওপার দেখা যায় ঐ দিগন্তের পাড়।
রাখাল বালক গরু নিয়ে ফিরছে নিজের ঘরে,
মনটা আমার কেমন জানি হু-হু কেন করে?
পাখিরা সব ফিরছে নীড়ে ডানা দুটি মেলে,
মনটা আমার হারিয়ে যায় সেই অতীতে গেলে।
তীরে বসে একলা আমি দেখি সূর্য ডোবা,
তোমার জলে মিশে আছে গোধূলি বেলার আভা।
সুন্দর এই দৃশ্যে আমার ভরে গেল মন,
ফুরিয়ে যাচ্ছে বেলা তবু কাটে না এ ক্ষণ।
যমুনেশ্বরী, তোমার সাথে মিতালী হোক শুরু;
স্মৃতির মাঝে আজও বাজে নূপুরেরই দুরুদুরু!
কবিতার মূলভাব ও প্রেক্ষাপট
ওগো যমুনেশ্বরী কবিতাটি উত্তরবঙ্গের শান্ত ও স্নিগ্ধ যমুনেশ্বরী নদীকে ঘিরে এক স্মৃতিময় আখ্যান। কবি পড়ন্ত বিকেলে নদীর তীরে বসে একাকিত্ব অনুভব করলেও তাঁর মানসপটে ভেসে ওঠে হারানো শৈশব। নদী এখানে কেবল প্রকৃতির অংশ নয়, বরং অতীত ও বর্তমানের এক যোগসূত্র।
পুরো কবিতায় উত্তরবঙ্গের চিরচেনা গ্রামীণ রূপ ফুটে উঠেছে—বাঁশঝাড়ের হিমেল হাওয়া, রাখাল বালকের ঘরে ফেরা, আর শান্ত জলে হাঁসের খেলা। শৈশবের সেই চঞ্চল দিনগুলোতে জেলেরা যখন মাছ ধরত, তখন ত্যাজ্য মনে করে ফেলে দেওয়া ছোট মাছগুলো ছিল কবির দলের কাছে অমূল্য সম্পদ। সেই মাছ আর বাড়ি থেকে আনা সামান্য উপকরণ দিয়ে নদীর পাড়ে চলত আনন্দের আয়োজন—যাকে আঞ্চলিক ভাষায় বলা হয় ভুলকানী বা চড়ুইভাতি।
কবিতার শেষে শীত পেরিয়ে বসন্তের আগমন এবং গোধূলি বেলার ম্লান আলো কবির হৃদয়ে বিষণ্নতা জাগিয়ে তোলে। শৈশবের সেই সাথীরা আজ নেই, কিন্তু নদীর কলতানে আজও সেই নূপুরের দুরুদুরু শব্দ পাওয়া যায়। এটি জীবনের বয়ে চলা এবং হারানো দিনের প্রতি এক গভীর দীর্ঘশ্বাসের কাব্য।
© ২০২৬ | জে. এইচ. শুভ এর কাব্যসংগ্রহ